বাবা অফিস থেকে ফেরার পর মায়ের কাছে শুনলেন। কাপড় পরিবর্তন না করেই ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন নাম কাটা গেল? মেট্রিক পরীক্ষার তখন মাত্র তিন মাস বাকি। বাবা সেই অবস্থায় গেলেন হেডমাস্টার মশাইয়ের কাছে। অনুনয়-বিনয় করলেন। হেডমাস্টার মশাই সহানুভূতি দেখালেন, কিন্তু শাস্তি তো তিনি দেননি। দিয়েছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। তাঁকেই অনুরোধ করতে বললেন।
বাবা সেই রুক্ষ করা মেজাজের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার মশাইয়ের কাছে গিয়ে ছেলের শাস্তি মাফ করার জন্য অনুরোধ করলেন। অবশেষে পাথর গলল। কথাটা বললাম হেমন্তের মনের জায়গাটা বোঝার জন্য। আর পাঁচজন বাবার মতো ছিলেন না হেমন্তের বাবা। এটাই ছিল হেমন্তের জন্য বিস্ময়ের। বাবা যদি একটু বলতেন অথবা মারতেন, তাহলেও সহ্য হতো। কিন্তু এত অপমান সয়েও তিনি ছেলেকে কিছু বললেন না, বড় হয়ে হেমন্ত সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পেয়েছিলেন। অনেকেই হেমন্তের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে, কিন্তু তিনি তা সয়ে গেছেন।
গ্রাম থেকে কলকাতায় দুই রুমের এক বাড়িতে এসে উঠেছিলেন হেমন্তের মা-বাবা। হেমন্তকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলে। সেখান থেকেই মিত্র ইনস্টিটিউশন। হেমন্তের বাবা ছিলেন জগদীশ নামের একটি ছেলের গৃহশিক্ষক। চাকরির টাকায় সংসার চলত না বলে ছাত্র পড়াতে হতো তাঁকে। হেমন্তকেও নিয়ে যেতেন জগদীশের বাড়িতে। একই সঙ্গে দুজনের পড়া হয়ে যেত। তাতে জগদীশের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল হেমন্তের। তাই জগদীশের স্কুল, অর্থাৎ মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল হেমন্তের। এর পরের ঘটনা তো বলাই হলো। যা বলা হলো না, তা হলো সেখানেই সহপাঠী হিসেবে অন্যদের মধ্যে হেমন্ত পেয়েছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে, যাঁর কথা দিয়ে এই লেখা আমরা শুরু করেছিলাম।
কলকাতায় আসার পর দেখলেন যাত্রাগান। ‘মীরাবাই’ পালা দেখে অভিভূত হলেন। ভাবলেন, কীভাবে এত সুন্দর করে গাইতে পারে কেউ। নিজে নকল করার চেষ্টা করলেন। লক্ষ করলেন, কোনো গান শুনলেই সুরটা ঠিক চুম্বকের মতো তাঁর গলায় চলে আসছে। শ্যামসুন্দর বলে স্কুলের এক বন্ধু ছিল, যার বাড়িতে হারমোনিয়াম, তবলা, গ্রামোফোন রেকর্ড—সবই ছিল। হেমন্ত সে বাড়িতে যেতেন মনের খোরাক মেটাতে। নতুন গান শুনলেই শ্যামের বাড়িতে এসে হারমোনিয়ামে গান তুলতেন হেমন্ত। সে বাড়ির সবাই তাঁকে উৎসাহ দিত। ছোটখাটো কোনো অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার ইচ্ছা জাগত হেমন্তের, কিন্তু কে আর এই গরিব ছেলেটার পাশে এসে দাঁড়াবে?
এসব দেখে খেপে উঠেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। স্কুলের ফাংশনে এত মানুষ গান গায়, কেন হেমন্ত চান্স পাবে না? তখন ওরা ক্লাস নাইনে পড়ে। হেমন্তকে কেউ পাত্তা দেয় না। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘তোকে আর স্কুলের ফাংশনে গাইতে হবে না। ওরা ভালো গায়কদের নিয়ে ফাংশন করুক। তুই চল আমার সঙ্গে রেডিও স্টেশনে। অডিশনের ব্যবস্থা পাকা করে এসেছি।’
সুভাষ মুখোপাধ্যায় সত্যিই এমন। তাঁকে নিয়ে হাজির হলেন অডিশন দেওয়ার জন্য। গানের অডিশন নিয়েছিলেন বি কে নন্দী। হেমন্ত শুনিয়েছিলেন, ‘আজও পড়ে গো মনে’ গানটি। এটি মূলত ছিল সন্তোষ সেনগুপ্তর গাওয়া।
দুটো গান করার কথা। আরেকটা গান তবে কোনটা হবে? শচীন দেববর্মনের অন্ধ ভক্ত হেমন্ত ঠিক করলেন আরেকটা করবেন ভাটিয়ালি। পাড়ার নিরাপদ চক্রবর্তী ভাটিয়ালি গান করতেন, তাঁকে ধরায় তিনি গান দিতে রাজি হলেন। রেকর্ডিং করার জন্য রেডিও স্টেশনে চললেন হেমন্ত আর সুভাষ, ট্রামে করে। গান করলেন। ভয়ডর ছিল না মনে। হেমন্তের একটা বড় ব্যাপার ছিল, তিনি ফলের আশা করতেন না। বলতেন, ‘শুধু মুখ বুজে কাজ করে যাও, দেখবে ঠিক উতরে গেছ।’
বাড়িতে খুব হাসিখুশি হয়ে ফিরলেন হেমন্ত। অনেকেই বললেন, প্রথম গানটা নাকি হয়েছে পঙ্কজ মল্লিকের ঢঙে। তখন থেকেই কেউ কেউ তাদের বাড়িতে নিয়ে যেত হেমন্তকে। সেই থেকেই রেওয়াজে আর কার্পণ্য করেননি তিনি।
সে সময় গানের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও চলছিল। সুভাষ কবিতা লিখতেন, হেমন্ত লিখতেন গল্প। এরই মধ্যে একদিন সুভাষ বলে উঠলেন, ‘সাহিত্য নিয়ে তো খুব মাতামাতি হচ্ছে, কিন্তু গান ছাড়লে চলবে না। রেডিওতে গান হয়েছে, এবার রেকর্ডের চেষ্টা করতে হবে।’
হেমন্তকে নিয়ে বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানিতে গেলেন সুভাষ। সেনোলা, পাইওনিয়ার, মেগাফোন, এইচএমভি। কেউ পাত্তা দিল না। রেকর্ড করার ব্যাপারে মনে যে ক্ষীণ আশা ছিল, সেটা আর পূরণ হলো না সে সময়। তবে গানের রেওয়াজ চলতেই থাকল। আর চলল সাহিত্যচর্চা। দেশ পত্রিকায় বের হলো গল্প, ‘একটি ঘটনা’ নামে। সাহিত্য সভায় নতুন নতুন গল্প লেখা চলতে থাকল।
বাবা সেই রুক্ষ করা মেজাজের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার মশাইয়ের কাছে গিয়ে ছেলের শাস্তি মাফ করার জন্য অনুরোধ করলেন। অবশেষে পাথর গলল। কথাটা বললাম হেমন্তের মনের জায়গাটা বোঝার জন্য। আর পাঁচজন বাবার মতো ছিলেন না হেমন্তের বাবা। এটাই ছিল হেমন্তের জন্য বিস্ময়ের। বাবা যদি একটু বলতেন অথবা মারতেন, তাহলেও সহ্য হতো। কিন্তু এত অপমান সয়েও তিনি ছেলেকে কিছু বললেন না, বড় হয়ে হেমন্ত সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পেয়েছিলেন। অনেকেই হেমন্তের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে, কিন্তু তিনি তা সয়ে গেছেন।
গ্রাম থেকে কলকাতায় দুই রুমের এক বাড়িতে এসে উঠেছিলেন হেমন্তের মা-বাবা। হেমন্তকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলে। সেখান থেকেই মিত্র ইনস্টিটিউশন। হেমন্তের বাবা ছিলেন জগদীশ নামের একটি ছেলের গৃহশিক্ষক। চাকরির টাকায় সংসার চলত না বলে ছাত্র পড়াতে হতো তাঁকে। হেমন্তকেও নিয়ে যেতেন জগদীশের বাড়িতে। একই সঙ্গে দুজনের পড়া হয়ে যেত। তাতে জগদীশের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল হেমন্তের। তাই জগদীশের স্কুল, অর্থাৎ মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল হেমন্তের। এর পরের ঘটনা তো বলাই হলো। যা বলা হলো না, তা হলো সেখানেই সহপাঠী হিসেবে অন্যদের মধ্যে হেমন্ত পেয়েছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে, যাঁর কথা দিয়ে এই লেখা আমরা শুরু করেছিলাম।
কলকাতায় আসার পর দেখলেন যাত্রাগান। ‘মীরাবাই’ পালা দেখে অভিভূত হলেন। ভাবলেন, কীভাবে এত সুন্দর করে গাইতে পারে কেউ। নিজে নকল করার চেষ্টা করলেন। লক্ষ করলেন, কোনো গান শুনলেই সুরটা ঠিক চুম্বকের মতো তাঁর গলায় চলে আসছে। শ্যামসুন্দর বলে স্কুলের এক বন্ধু ছিল, যার বাড়িতে হারমোনিয়াম, তবলা, গ্রামোফোন রেকর্ড—সবই ছিল। হেমন্ত সে বাড়িতে যেতেন মনের খোরাক মেটাতে। নতুন গান শুনলেই শ্যামের বাড়িতে এসে হারমোনিয়ামে গান তুলতেন হেমন্ত। সে বাড়ির সবাই তাঁকে উৎসাহ দিত। ছোটখাটো কোনো অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার ইচ্ছা জাগত হেমন্তের, কিন্তু কে আর এই গরিব ছেলেটার পাশে এসে দাঁড়াবে?
এসব দেখে খেপে উঠেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। স্কুলের ফাংশনে এত মানুষ গান গায়, কেন হেমন্ত চান্স পাবে না? তখন ওরা ক্লাস নাইনে পড়ে। হেমন্তকে কেউ পাত্তা দেয় না। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘তোকে আর স্কুলের ফাংশনে গাইতে হবে না। ওরা ভালো গায়কদের নিয়ে ফাংশন করুক। তুই চল আমার সঙ্গে রেডিও স্টেশনে। অডিশনের ব্যবস্থা পাকা করে এসেছি।’
সুভাষ মুখোপাধ্যায় সত্যিই এমন। তাঁকে নিয়ে হাজির হলেন অডিশন দেওয়ার জন্য। গানের অডিশন নিয়েছিলেন বি কে নন্দী। হেমন্ত শুনিয়েছিলেন, ‘আজও পড়ে গো মনে’ গানটি। এটি মূলত ছিল সন্তোষ সেনগুপ্তর গাওয়া।
বাড়িতে খুব হাসিখুশি হয়ে ফিরলেন হেমন্ত। অনেকেই বললেন, প্রথম গানটা নাকি হয়েছে পঙ্কজ মল্লিকের ঢঙে। তখন থেকেই কেউ কেউ তাদের বাড়িতে নিয়ে যেত হেমন্তকে। সেই থেকেই রেওয়াজে আর কার্পণ্য করেননি তিনি।
সে সময় গানের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও চলছিল। সুভাষ কবিতা লিখতেন, হেমন্ত লিখতেন গল্প। এরই মধ্যে একদিন সুভাষ বলে উঠলেন, ‘সাহিত্য নিয়ে তো খুব মাতামাতি হচ্ছে, কিন্তু গান ছাড়লে চলবে না। রেডিওতে গান হয়েছে, এবার রেকর্ডের চেষ্টা করতে হবে।’
হেমন্তকে নিয়ে বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানিতে গেলেন সুভাষ। সেনোলা, পাইওনিয়ার, মেগাফোন, এইচএমভি। কেউ পাত্তা দিল না। রেকর্ড করার ব্যাপারে মনে যে ক্ষীণ আশা ছিল, সেটা আর পূরণ হলো না সে সময়। তবে গানের রেওয়াজ চলতেই থাকল। আর চলল সাহিত্যচর্চা। দেশ পত্রিকায় বের হলো গল্প, ‘একটি ঘটনা’ নামে। সাহিত্য সভায় নতুন নতুন গল্প লেখা চলতে থাকল।


0 Comments: